মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হচ্ছে বাগমারায় উৎপাদিত পান

আবু বাককার সুজন বাগমারা (রাজশাহী) রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, চট্রগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা সদরের হাট-বাজারগুলোতে স¤প্রতি রাজশাহীর বাগমারায় উৎপাদিত পানের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও বর্তমানে বাগমারায় উৎপাদিত পানের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগের জেলা সদরের হাট-বাজারগুলোতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০ ট্রাক পান এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে রপ্তানী (সরবরাহ) করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাজারে পানের মূল্য বৃদ্ধি ও বৈদেশিক চাহিদার কারণে এ উপজেলার কৃষকেরা এখন পানচাষে ঝুুঁকে পড়েছেন। চলতি মওসুমে উপজলোর বভিন্নি এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক কৃষক নতুন করে পানবরজ তৈরী করেছেন। পান অত্যন্ত লাভজনক ফসল হওয়ায় এ উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে এখন নতুন নতুন পানবরজ তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন চাষীরা।

উপজেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাগমারায় প্রায় সাড়ে আট হাজার বিঘা জমিতে পানবরজ রয়েছে। তবে স্থানীয় বাজার ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পানের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্বের তুলনায় এখানকার চাষীরা এখন পান উৎপাদনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ কারণে এ উপজেলায় এবার এত বেশী পানবরজ তৈরি করা হয়েছে যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এক সময় শুধুমাত্র গনিপুর, শ্রীপুর ও শুভডাঙ্গা ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে পানচাষ হত। তবে পান অত্যন্ত লাভজনক ফসল হওয়ায় তাহেরপুর পৌর এলাকাসহ মাড়িয়া, হামিরকুৎসা, যোগীপাড়া, গোবিন্দপাড়া, নরদাশ, বাসুপাড়া ও আউচপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়ও বর্তমানে বানিজ্যিকভাবে পানচাষ শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, বাগমারার গণিপুর, শ্রীপুর, আউচপাড়া, বাসুপাড়া, গোবিন্দপাড়া ও শুভডাঙ্গা এই ছয়টি ইউনিয়নের দশ হাজার কৃষক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পানচাষের ওপর নির্ভরশীল। অভাব অনটনে ভরা অস্বচ্ছল ওইসব কৃষক পরিবারে এখন পানচাষে ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। সংসারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা। ছেলে-মেয়েদের লিখাপড়া ও ভরণ-পোশনসহ সংসার পরিচালনার যাবতীয় খরচের যোগান আসছে পানচাষ থেকেই। নরদাশ ইউনিয়নের মনোপাড়া গ্রামের পানচাষী আবু জাফর বলেন, বর্তমানে পানবরজ তৈরির উপকরণের দাম ও শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন পানবরজ তৈরিতে খরচ অনেক বেশি লাগছে। তারপরও দেশ-বিদেশে পানের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং পান অত্যন্ত লাভজনক ফসল হওয়ায় পানচাষ করে কৃষকেরা এখন লাভবান হচ্ছেন। শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের বুজরুককৌড় গ্রামের পানচাষী আফজাল হোসেন ও আকবর আলী বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে পানবরজ তৈরি করতে ৭০ থেকে ৮০ হাজার  টাকা খরচ হচ্ছে। এর বিপরীতে উৎপাদিত পান বিক্রয় করে বছরে প্রায় ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ পাওয়া যায়।

এদিকে হাটগাঙ্গোপাড়া, মচমইল, মোহনগঞ্জ, মাদারীগঞ্জ এবং ভবানীগঞ্জ ও তাহেরপুর পৌরহাটসহ প্রায় প্রতিটি হাট-বাজরেই এখন সপ্তাহে দুইদিন করে পৃথকভাবে বসানো হচ্ছে পান ক্রয়-বিক্রয়ের হাট। এসব পানের হাট ইজারা থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে বিপুল পরিমান রাজস্ব। আগের তুলনায় বর্তমানে যোগযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়ায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে পৌঁছে যাচ্ছে তাজা-টাটকা সতেজ পান। এসব মোকাম থেকে বাছাই করা উন্নত জাতের পান রপ্তানী হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে।

তাহেরপুর পৌর এলাকার পান ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ পান উৎপন্ন হয় রাজশাহী জেলার বাগমারা ও মোহনপুর উপজেলায়। এই দুইটি উপজেলার উৎপন্ন পান অত্যন্ত সুস্বাধু ও উন্নতমানের হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদাও ব্যাপক। এ কারণে বাগমারা ও মোহনপুরের উৎপন্ন পান বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরান, তেহরান, রোমানীয়া, মালোয়েশীয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হচ্ছে।

বাসুপাড়া ইউপির সগুনা গ্রামের কৃষক আয়েন উদ্দিন ও বেলাল হোসেন  বলেন,  পানচাষে পরিশ্রম বেশি। প্রতিদিনই পান গাছের যতœ নিতে হয়। তারপরও পানচাষীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পান নিয়ে গবেষনা না থাকায় পানবরজে একবার মড়ক দেখা দিলে আর রক্ষা নেই। মরে যায় পাতাসহ পানগাছের কান্ড। তারা আরো বলেন, বর্তমানে পানের দাম ভাল এটা সত্যি। কিন্তু এখন পানচাষ করতে হলে বাঁশ বাতা, খড়, চিকন তার এবং শ্রমিক থেকে শুরু করে সব উপকরণই কিনতে হয় চড়া দামে। যার কারণে খরচ অনেক বেশী হয়। চাষীদে অভিযোগ, ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও পানচাষ সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষনার অভাবে এবং বিভিন্ন সমস্যায় প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় পানচাষীরা বার বার লোকসানের মুখে পড়েছেন। তার পরও তারা হাল ছাড়েননি। তাই উপজেলা পর্যায়ে পানচাষীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ পানচাষ বিষয়ে সরকারের কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগের আরো সক্রিয় ভুমিকা আশা করছেন পানচাষীরা।

বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান বলেন, পান অত্যন্ত লাভজনক একটি ফসল। এ কারণে কৃষকদের মাঝে পানচাষে আগ্রহ বৃদ্ধি লক্ষ্যে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিতে উপজেলা কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *