অপরিকল্পিতভাবে নতুন ট্রেন চালু করায় শিডিউল বিপর্যয়ের মতো ঘটনা ঘটছে রেলওয়েতে

আবুল কালাম আজাদ:-বাংলাদেশ রেলওয়েতে নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে জার্মান,যুক্তরাষ্ট্
,মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব প্রকল্পে জাপান, চীনসহ অনেক দেশ।
 এসব নতুন রেলপথ নির্মাণে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানাতে ২০ মে সন্ধ্যায় রেল ভবনে ,রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ। পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত।
এর আগে গত মার্চে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের রেলওয়ে কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বানও জানিয়েছিলেন মন্ত্রী।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দ্রুতগতির ট্রেন চালু, দেশের বড় স্টেশনগুলোকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে রূপান্তর, ঢাকা শহরের চারপাশে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের মতো বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির ট্রেন প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব প্রকল্পে জাপান।
কোন কাজটি আগে করতে হবে, কোনটি পরে—তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেই সবার ঝোঁকটা বেশি, রেলওয়েতেও তাই হচ্ছে। ত তাই আমাদের দেশের রেললাইনে অবস্থা এত নাজূক , রেল লাইনে সক্ষমতার চেয়ে ট্রেন চলাচল বেশি, নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা দুর্বল,  কোনো জবাবদিহি করতে হয় না, সংশ্লিষ্টরা এসব কাজে পেশাদার নয।যারডলে যত টাকাই বিনিয়োগ করা হোক না কেন, তা আদতে কোনো কাজে আসবে না।
গত পাঁচ দশকে দেশে রেলপথ বেড়েছে সাকুল্যে ১৬০ কিলোমিটার। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার যে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি, তা এ তথ্যেই পরিষ্কার। এ সময়ে রেল যোগাযোগের উন্নয়নে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ তো ছিলই না, উল্টো তাদের পরামর্শ-সুপারিশে আরো সংকুচিত হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে গত এক দশকে কিছুটা হলেও এ চিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো উন্নয়ন সহযোগীরা বিনিয়োগ করছে রেলের বিভিন্ন প্রকল্পে। উন্নয়ন সহযোগীদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালেও অদূরদর্শী বিনিয়োগের কারণে রেলের সেবার মানে যে অধোগতি, তাতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে গত এক যুগে। এ সময়ে নতুন রেলপথ নির্মাণ, রোলিংস্টক সংগ্রহ, রেলপথ ও স্টেশন ভবন নির্মাণ ও পুনর্বাসন, সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে সরকার। ছোট-বড় মিলিয়ে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ৬৪টি প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। পরের দুই বছরে খরচ করা হয়েছে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা।
তবে এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও গত এক দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান খুব একটা বদলায়নি। ট্রেন পরিচালনায় অব্যাহত লোকসানের পাশাপাশি শিডিউল বিপর্যয়, দুর্ঘটনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সংস্থাটি। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের যে ভাটা ছিল, তারই ফলে রেলের এ বেহাল অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরিকল্পিতভাবে নতুন ট্রেন চালু করায় শিডিউল বিপর্যয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। ২০১৩-১৪ সালেও ট্রেনের গড় সময়ানুবর্তিতার হার ছিল ৬৪ শতাংশের বেশি। সেখান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২০১৮ সালে সময়ানুবর্তিতার হার দাঁড়ায় প্রায় ৮৪ শতাংশে। তবে এরপর থেকে রেলওয়ের সময়সূচিতে আবারো দেখা দিয়েছে উল্টোরথে চলার লক্ষণ। ২০১৯ সালে ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলার হার নেমে আসে প্রায় ৮২ শতাংশে। কয়েক বছর ধারাবাহিক উন্নতির পর এ ছন্দপতনের কারণ হিসেবে রেলপথের গতি সক্ষমতা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তা মিলে বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চলমান আছে ৩৯টি প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১ হাজার কোটি টাকাই বিদেশী বিনিয়োগ। এডিবি, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) মতো উন্নয়ন সহযোগীদের পাশাপাশি ভারত ও চীন বিনিয়োগ করেছে। এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রকল্পে বিনিয়োগ রয়েছে ভারতের। এডিবি ও চীন একাধিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকেও বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিদেশী বিনিয়োগের বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গতকাল রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, বর্তমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপে বর্তমানে রেলওয়ে একটি ম্যাচিউর অবস্থায় চলে এসেছে। মূলত এ কারণেই বিদেশী সংস্থাগুলো দেশের রেল যোগাযোগে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সামনের দিনগুলোতে আমরা রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে রেলকে আধুনিকায়ন করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। পাশাপাশি রেলওয়ের ব্যবস্থাপনাটির আধুনিকায়ন করতে চাই। পর্যায়ক্রমে দেশের রেলপথগুলোকে ডাবল লাইনে উন্নীত ও বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তুলতে চাই। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা এসব বিষয়কে প্রাধান্য দেব। শুধু রেল নয়, সারা দেশে আমরা একটি সমন্বিত ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
উন্নয়নের জন্য কেবল বিদেশী বিনিয়োগেরই ওপরই নির্ভর করছে না, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই বর্তমানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। চলমান প্রকল্পগুলো সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেলের সেবার মানসহ সার্বিক পরিস্থিতির তেমন উন্নয়ন না হওয়ার জন্য ভুল ও অদূরদর্শী পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, রেলওয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয়ের একটা বড় ঘাটতি আছে।
কোন কাজটি আগে করতে হবে, কোনটি পরে—তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেই সবার ঝোঁকটা বেশি, রেলওয়েতেও তাই হচ্ছে। আমাদের রেললাইন খারাপ, আমাদের লাইনে সক্ষমতার চেয়ে ট্রেন চলাচল বেশি, আমাদের পরিকল্পনা দুর্বল, আমাদের কোনো জবাবদিহি করতে হয় না, আমরা পেশাদার নই। সরকার ও রেলওয়ের এসব বিষয় মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত ও বাস্তবায়ন করা উচিত। তা না হলে যত টাকাই বিনিয়োগ করা হোক না কেন, তা আদতে কোনো কাজে আছেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *