প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বাগমারায় কৃষিজমিতে চলছে পুকুর খননের মহোৎসব

বাগমারা প্রতিনিধি: রাজশাহীর বাগমারায় স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কৃষিজমিতে এখন পুকুর খননের মহোৎসব চলছে। কৃষিজমির প্রকৃতি (শ্রেণী) পরিবর্তন করে পুকুর খননের উপর মন্ত্রনালয়ের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছেনা এ উপজেলায়। স্থানীয় প্রশাসনের মদদ থাকায় রাজশাহীর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও বন্ধ হয়নি কৃষিজমিতে পুকুর খনন কাজ। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা মানববন্ধন কর্মসূচীও পালন করেছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বাগমারার প্রভাবশালী একটি মহল কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের আবাদি জমিতে জোরপূর্বক পুকুর খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর পুকুর খননের নামে ফসলি জমির টপসয়েল অবাধে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এভাবে অবাধে পুকুর খনন করা হলে এ উপজেলায় আবাদি জমির পরিমান কমে গিয়ে খাদ্যসঙ্কট দেখা দেয়াসহ পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনেরা।
সরেজমিনে উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের বৈলসিংহ স্কুল এ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন কিশমত বিহানালী বিলে, বাসুপাড়া ইউনিয়নের হলুদঘর বিলে, গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের তেলিপুকুর গাঙ্গোপাড়া বিলে, গনিপুর ইউনিয়নের লাউপাড়া ও এতডালা বিলে এবং নরদাশ ইউনিয়নের মধ্য দৌলতপুর বিলসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৪টি স্পটে বর্তমানে পুকুর খননের নামে প্রকাশ্যে ভেকু দিয়ে কৃজিজমির টপসয়েল কেটে ট্রাক্টর যোগে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করতে দেখা গেছে। এলাকার প্রভাবশালী আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে ১০/১২ জনের একটি চক্র বৈলসিংহ স্কুল সংলগ্ন বিলে দিঘি খননের নামে কৃষি জমির মাটি কেটে তক্তপাড়া এলাকাস্থ বাবুর ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে আমজাদ হোসেন ওই দিঘি খননের সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকার কথা অস্বীকার করে বলেছেন- ভাটা মালিক বাবু তার ইটভাটায় মাটি নেয়ার জন্য ওই দিঘি খনন করছেন। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তরের এক অফিস সহকারীর সঙ্গে তার ভাল সম্পর্ক থাকায় প্রশাসনের বিষয়টি তিনিই দেখেছেন বলে জানান।
এদিকে হাট বাইগাছা এলাকার প্রভাবশালী ইব্রাহিম হোসেন এবং মতিউর রহমানের দু’টি ইটভাটায় মাটি নেয়ার জন্য ভাটা সংলগ্ন হলুদঘর বিলে কৃষি জমিতে একই সাথে দু’টি পুকুর খননের কাজ শুরু করা হয়েছে। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খননকৃত ওই দু’টি পুকুরের মাঝখানে রয়েছে পল্লীবিদ্যুতের দু’টি পোল। পুকুর খননের কারণে বিদ্যুতের ওই পোল দু’টি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়লেও কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টর যোগে ওই দু’টি ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর ট্রাক্টরযোগে দিন-রাত সমানতালে ইটভাটায় মাটি সরবরাহ করায় হাটবাইগাছা থেকে বসন্তপুর মোড় পর্যন্ত পাকা রাস্তাটি পুরোটাই নষ্ট হয়ে হাটুপর্যন্ত ধূলা জমে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ কারণে ওই রাস্তায় চলাচলকারীদের বর্তমানে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের মৌখিক অনুমোতি নিয়েই পুকুর খনন করে ইটভাটায় মাটি নেয়া হচ্ছে বলে ভাটা মালিকরা জানান। অপরদিকে নরদাশ ইউনিয়নের মধ্য দৌলতপুর গ্রামে পুকুর খননকারী কলেজ শিক্ষক আস্তানুর রহমান এ পর্যন্ত মোট ছয়টি পুকুর খনন করার কথা স্বীকার করেছেন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুকুর খননকারী একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানান- উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর এবং থানার সঙ্গে যোগাযোগ না করে কেউ পুকুর খনন করতে গেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করা হয় এবং পুলিশ এসে ভেকুর চাবি কেড়ে নিয়ে যায়। সেই চাবি উদ্ধার করতে লাগে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তবে উপজেলা প্রশাসন ও থানাকে ম্যানেজ করলে আর কোনো সমস্যা হয় না। এ ক্ষেত্রে জমির পরিমান অনুযায়ী প্রতিটি পুকুরের জন্য তিন লাখ থেকে চার লাখ পর্যন্ত টাকা দিতে হয়।
এদিকে গত বছরের ১১ জুন ভূমি মন্ত্রণালয়ের জৈষ্ঠ্য সহকারী সচিব এ.টি.এম আজাহারুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এ বিষয়ে নীতিমালা সংক্রান্ত একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, “কৃষিজমি যতটুকু সম্ভব রক্ষা করতে হবে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমেরতি ছাড়া জমির প্রকৃতিগত কোনো পরিবর্তন করা যাবে না”। ওই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ওই চিঠির একটি অনুলিপিও পাঠানো হয়েছে বলে উভয় দপ্তরের দায়িত্বশীল দুইজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। কিন্তু ওই নীতিমালা বাস্তবায়নতো দূরের কথা বাগমারায় বর্তমানে পুকুর খননের পরিমান আরো চারগুন বেড়েছে।
বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান বলেন, এ উপজেলা আবাদি জমিতে নির্বিচারে পুকুর খননের কারণে চাষযোগ্য জমির পরিমান ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বলেন, কৃষককের ক্ষতি করে কাউকে পুকুর খনন করতে দেয়া হবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, পুকুর খননের অনুমোতি দেয়া বা না দেয়ার দায়িত্ব থানার নয়। বিষয়টি দেখার দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী অফিসারের।
বাগমারার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরিফ আহম্মেদ বলেছেন, বাগমারায় কৃষিজমিতে পুকুর খননের জন্য কাউকে লিখিতভাবে অনুমোতি দেয়া হয়নি।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *