বাগমারায় ব্রিজ-কালভাট ও স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে মাছচাষ  ৪০ হাজার একর জমিতে চাষাবাদ অনিশ্চিত

বাগমারা থেকে আবু বাককার সুজন: রাজশাহীর বাগমারায় অধিকাংশ ব্রিজ-কালভাট ও স্লুইস গেটের মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছচাষ শুরু করেছেন প্রভাবশালীরা। অবৈধভাবে ব্রিজ-কালভাট ও স্লুইস গেটগুলোর মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছচাষের কারণে খাল-বিল ও নদী-নালার স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে প্রায় ৪০ হাজার একর আবাদি জমিতে এখন চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে পানির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষে বন্ধ দাঁড়া ও স্লুইস গেটগুলোর মুখ খুলে দেয়ার দাবিতে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি আবেদনও করা হয়েছে।
অভিযোগ ও এলাকাবাসী সুত্রে জানা যায়, গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের গোবিন্দপাড়া স্কুল সংলগ্ন ব্রিজের মুখে মাটি ফেলে বোয়ালিয়া বিলের পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়ে পুকুর খনন করা হয়েছে। গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের জশাই বিলের পানি নামার একমাত্র পথ রামরামা দাঁড়ার মুখ, তাতিপাড়া দাঁড়ার মুখ এবং রামরামা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে দু’টি বিলের পানি নামার পথ দাঁড়ার মুখে ইট গেঁথে বন্ধ করে দিয়ে মাছ চাষ করছেন এক জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পক্ষ। বাসুপাড়া ও গনিপুর ইউনিয়নের সোনাবিলের পানি নামার একমাত্র মাধ্যম উপজেলা সদর ভবানীগঞ্জ-বাগমারা থানার মোড় পর্যন্ত সড়কের গোপালপুর স্লুইসগেট এবং গোপালপুর-দেউলিয়া সড়কের স্লুইস গেটের মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন এলাকার প্রভাবশালী একটি মহল। এতে ওই বিলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে শতশত একর জমির পানবরজ নষ্ট হয়ে গেছে। বাসুপাড়া ইউনিয়নের নন্দনপুর, বালানগর, দেউলিয়া ও সগুনা গ্রামের মধ্যে দিয়ে গোপালপুর হয়ে একটি দাঁড়া ফকিরনী নদী পর্যন্ত বয়ে গেছে। সম্প্রতি এলাকার প্রভাবশালী একটি মহল সগুনা গ্রামের নিকট ওই দাঁড়ার মুখ, কাদার বিলের পানি নামার মুখ, পোড়াকয়া গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া দাঁড়ার মুখ ও বালানগর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দাঁড়ার মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছচাষ করায় পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে এলাকার কৃষি জমিগুলো জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে।
অবৈধভাবে ব্রিজ-কালভাট ও স্লুইস গেটগুলোর মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছচাষের কারণে ফসলি জমিতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে মোহম্মাদপুর, সগুনা, দ্বীপনগর, মাধাইমুড়ি ও বালানগরসহ উপজেলার শত শত বিঘা জমি অকেজ হয়ে পড়ে থাকছে। স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, বালানগর দয়ের ঘাটের মুখ ও মোহম্মাদপুর-সগুনা দাঁড়ার মুখসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ দাঁড়া মুখে ও মাঝখানে বাঁশের বানা দ্বারা বেড়া দিয়ে, মাটি ফেলে আবার কোনো কোনো স্থানে ইট গেঁথে স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সম্প্রতি তাহেরপুর-শিকদারি রোডের দু’টি বড় ব্রিজের মুখ বন্ধ করে দিয়ে দুই পার্শ্বের বিলের কৃষি জমিতে প্রায় অর্ধশতাধিক পুকুর খনন করে মাছ চাষ শুরু করায় এলাকাবাসীরা বর্তমানে চরম দূর্ভোগে পড়েছেন। মোহম্মাদপুর গ্রামের কৃষক আবু সাঈদ, হাতেম আলী ও সাহেব আলী জানান, গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দাঁড়ার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে অন্তত: ১৫টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এতে করে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে এবারের বন্যার পানিতে ধান, পাট, পানবরজ, মরিজ ও শাক-শবজির ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছেন এলাকার কৃষকেরা।
বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান জানান, এবারের বন্যায় উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌর এলাকায় মোট ৩২ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ব্রিজ-কালভাট ও স্লুইস গেটগুলোর মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছচাষের কারণে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার একর জমিতে এখন চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমান আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে প্রভাবশালীরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে জমির প্রকৃতি (শ্রেণী) পরিবর্তন করে কয়েক দিন থেকে ব্যাপকভাবে পুকুর খনন কাজ শুরু করেছে। অভিযোগকারীরা আরো জানান, প্রভাবশালীদের হাত থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও ফসলি জমিতে নিয়ম বর্হিভূত অপরিকল্পিত পুকুর খনন বন্ধের জন্য দফায় দফায় সংশ্লি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কোন সুফল মিলেনি বলে তারা অভিযোগ করেন।
গোবিন্দপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিজন সরকার জানান, আমাদের ইউনিয়নের অধিকাংশ দাঁড়া, ব্রিজ ও কালভাটের মুখ বন্ধ করে প্রবাভশালীরা মাছচাষ করায় পানি নামতে পারছেনা। ফলে শতশত একর জমি কৃত্রিম জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। কাজেই অবিলম্বে পানির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষে বন্ধ দাঁড়া, কালভাট ও ব্রিজগুলোর মুখ খুলে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শরিফ আহম্মেদ বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের দু’টি ব্রিজের মুখ বন্ধ খুলে দেয়া হয়েছে। আরো যে সব দাঁড়ার মুখ বন্ধ করে দিয়ে প্রবাশালীরা মাছ চাষ করছে সেগুলোও খুলে দেয়া হবে এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *