বাগমারায় বন্যায় কৃষি ও মৎস্যখাতে ১৪০ কোটি টাকার ক্ষতি

আবু বাককার সুজন বাগমারা (রাজশাহী)ঃ রাজশাহীর বাগমারায় অনাকাঙ্খিত বন্যায় কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে মোট ১৪০ কোটি টাকার। এর মধ্যে ৩হাজার ৭৫৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে ক্ষতি হয়েছে ৩২ কোটি ৭০ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং অর্ধশত পুকুর ও বিল ডুবে চাষকৃত মাছ ভেসে যাওয়ায় মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০৭ কোটি টাকার।
বাগমারা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মওসুমে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে ১৭ হাজার ৭শ’ হেক্টর জমিতে রোপা ও আউশ ধান, ৩ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে রোপা ও আমন ধান এবং ১ হাজার ১৩৯ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছিলো। এ ছাড়া ১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে পানবরজ ছিলো। এর মধ্যে অনাকাঙ্খিত বন্যায় সোনাডাঙ্গা, গোবিন্দপাড়া, দ্বীপপুর, বড়বিহানালী, ঝিকরা, মাড়িয়া, হামিরকুৎসা ও গোয়ালকান্দিসহ ১১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ২১০ হেক্টর জমির রোপা ও আউশ ধান, ৫০০ হেক্টর জমির রোপা ও আমন ধান, ১০ হেক্টর জমির সবজি এবং ৩৫ হেক্টর জমির পানবরজসহ বিভিন্ন ফসল ডুবে যায়। এতে কৃষি খাতে প্রায় ৩২ কোটি ৭০ লাখ ২৮ হাজার টাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এ ছাড়া অর্ধশত পুকুর ও বিল ডুবে প্রায় ১০৭ কোটি টাকার চাষকৃত মাছ ভেসে গেছে। এ হিসাবে কৃষি ও মৎস্য খাতে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
উপজেলার সোনাডাঙ্গা ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমি চলতি মওসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে আউশ ও আমন ধান চাষ করেছিলাম। বন্যার পানিতে আমার সব জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। নরদাশ ইউনিয়নের মনোপাড়া গ্রামের কৃষক আবু জাফর বলেন, আমার সাত বিঘা জমির রোপা. আমন ও আউশ ধান বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে সম্পূর্ন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমি এখন দিশেহারা। দ্বীপপুর ইউনিয়নের লাউবাড়িয়া গ্রামের কৃষক জেহের আলী ও আব্দুল মালেকও একইভাবে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান জানান, দু’দফা বন্যায় বাগমারার বিভিন্ন এলাকায় ৩ হাজার ৭৫৫ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে কৃষি খাতে মোট ৩২ কোটি ৭০ লাখ ২৮ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে মর্মে তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে।
জানা যায়, অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে ভরে যায় উপজেলার সব নদী-নালা ও খাল-বিল। সেই সাথে মান্দায় টেংরা নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে ফুঁসে উঠে বাগমারার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া বারানই ও ফর্কিন্নী নদীর পানি। পানির প্রবল চাপে একের পর এক বারানই ও ফর্কিন্নী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রর বাঁধ ভাঙ্গতে শুরু করে। এক রাতের মধ্যে তলিয়ে যায় উপজেলা সদও ভবানীগঞ্জ পৌরসভার কয়েকটি এলাকাসহ সোনাডাঙ্গা, গোবিন্দপাড়া, দ্বীপপুর, বড়বিহানালী ও ঝিকরাসহ ১১টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েন লক্ষাধিক মানুষ। পানির প্রবল চাপে বিভিন্ন সড়ক ও বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় সোনাডাঙ্গা ও দ্বীপপুর ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা ও জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রলয়ংকারী এ বন্যায় ঘরের জানালা পর্যন্ত পানি উঠায় এবং কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়ায় প্রায় ২০ হাজার পরিবারের মানুষ গৃহহীন ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। বর্তমানে বন্যার পানি কমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্থ ঘরবাড়িগুলো এখনো বসবাসের অনুপযোগী রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ ওইসব পরিবারের লোকজন এখনো ঘরে ফিরতে পারছেন না। খাদ্য সংকট ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দুর্গতদের মাঝে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে এ পর্যন্ত সরকারীভাবে মোট ৫৮ টন চাল ত্রাণ হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে জানিয়েছেন বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফ আহম্মেদ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা প্রস্তুতের কাজ শেষ হলেই বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে গৃহহারা পরিবারের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও উপজেলার বিভিন্ন রাস্তায় নির্মিত ব্রিজ ও কালভেটগুলোর মুখে মাটি ফেলে বন্ধ করে দিয়ে এলাকার মৎস্যচাষীরা মাছ চাষ করায় বন্যার পানি নামতে বাঁধা পাচ্ছে। এ কারণে সোনাডাঙ্গা ও দ্বীপপুর ইউনিয়ন এখনো বন্যা কবলিত রয়েছে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, অনাকাঙ্খিত বন্যায় সোনাডাঙ্গা, দ্বীপপুর, কাচারী কোয়ালীপাড়া, বড়বিহানালী, ঝিকরা ও গোয়ালকান্দি ইউনিয়নে ৪০টি পুকুর ডুবে যায়। এসব পুকুর নেট দিয়ে ঘিরে মাছ আটকানোর চেষ্টা করা হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। বন্যার পানিতে পুকুরগুলোর চাষকৃত সব মাছ ভেসে গেছে। এছাড়া কয়েকটি বিলও ডুবে যাওয়ায় ওইসব বিলের চাষকৃত মাছ ভেসে গেছে।
এদিকে গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের চেউখালী গ্রামের আব্দুস সালাম জানান, অনাকাঙ্খিত বন্যায় তার ৫টি লেয়ার মুরগীর খামার ডুবে যায়। এতে তার প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া তার প্রজেক্টের ৫টি মাছের ঘের ডুবে যাওয়ায় মৎস্য খাতেও তার আরো প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বাগমারা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন বলেন, আকর্®ি§কভাবে বন্যা হওয়ায় মৎস্যচাষি ও পুকুর মালিকেরা সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেননি। এ কারণে চাষকৃত মাছ ভেসে গেছ। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ১০৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *