৬ বছর ধরে ঝুলে আছে রেলের  বগি তৈরির কারখানা নির্মাণ প্রকল্প

আবুল কালাম আজাদ;-নীলফামারীর সৈয়দপুর দেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে একটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এই শহর অনেক আগে থেকে প্রসিদ্ধ হলেও অনেকের কাছে রেলের শহর হিসেবে বেশি পরিচিত। এই রেলের শহর সৈয়দপুরে রয়েছে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় রেলের ছোট-বড় যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ লাইনের বগি মেরামতসহ সব কাজ করা হলেও ৬ বছর ধরে ঝুলে আছে ক্যারেজ বা বগি তৈরির জন্য কারখানা নির্মাণ প্রকল্প।
দেশেই রেলের ক্যারেজ বা বগি তৈরির জন্য সৈয়দপুরে কারখানা স্থাপনের জন্য ভারতের সঙ্গে ২০১৬ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। সেইসঙ্গে দুই বছর ধরে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কশপের জন্য নির্ধারিত স্থানে সাইনবোর্ড বসানো হয়। তারপর থেকে ঝুলে আছে এ প্রকল্প।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৭০ সালে ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত হয় দেশের প্রাচীন ও বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ রেল কারখানার ২৬টি উপ-কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করেন। প্রতিষ্ঠার পর এখানে নতুন কোচ তৈরি হতো। কিন্তু ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সরকার রেল সংকোচন নীতির আওতায় ওই কোচ নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে কোচ আমদানি করতে হয়। কোচের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে সৈয়দপুরে আরও একটি নতুন কোচ কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান সরকার। এ ব্যাপারে ভারতীয় সরকারের সঙ্গে ২০১৬ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। পরে দুই বছর ধরে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা এলাকায় নতুন ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কশপ নির্মাণে ব্যাপক সমীক্ষা চালায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয় ২০১৮ সালে।
সমীক্ষা অনুযায়ী সৈয়দপুর কারখানার উত্তর পাশে দার্জিলিং গেটসংলগ্ন এলাকায় কোচ তৈরির কারখানা স্থাপনে জায়গা নির্বাচন করা হয়। এজন্য প্রাথমিকভাবে রেলের ২০ একর জমি নেওয়া হয়। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ২০১৯ সালের মে মাসে কারখানাটির ধরনের জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। একই বছর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন নির্ধারিত এলাকা পরিদর্শন করেন।
কারখানার জন্য সরকার প্রাথমিকভাবে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। বাকি টাকা ঋণের জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। কিন্তু বরাদ্দের সেই টাকা ও ঋণ না পাওয়ায় কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। যার ফলে হতাশ রেলওয়ে কর্মচারীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত কাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে কারিগরি পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাবিবর রহমান হাবিব বলেন, জনবল সংকটে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা ধুঁকে ধুঁকে চলছে। রেলওয়ে কোচ তৈরির নতুন কারখানাটি স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৬ বছর আগে। কারখানা স্থাপনের খবরে রেল কর্মচারীদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তারা ভেবেছিল তাদের ছেলেমেয়েসহ এখানে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও কাজ শুরু না হওয়ায় আমরা হতাশ।
নীলফামারী চেম্বার অব কমার্সের সদস্য সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক বলেন, সৈয়দপুর একটি বাণিজ্যিক শহর। নতুন কোচ তৈরির কারখানাটি স্থাপন করা হলে এ অঞ্চলে ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস এম সলিমুল্লাহ বাহার বলেন, চলতি বছর অক্টোবর মাসের ১০ তারিখে প্রকল্পটির ভৌত কাঠামোর সমীক্ষা প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের প্ল্যানিং কমিশনে (পিএলসি) পাঠানো হয়েছে। আশা করছি আগামী অর্থবছরে কোচ কারখানার কাজ শুরু হবে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক সাদেকুর রহমান বলেন, প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন  হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে শিগগিরই তা আলোর মুখ দেখবে। কারখানাটি স্থাপন হলে এখানে নতুন বগি নির্মাণ করা সম্ভব। তখন আর বগি আমদানি করার প্রয়োজন হবে না। এতে রাষ্ট্রের অর্থের সাশ্রয় হবে।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য রাবেয়া আলিম বলেন, নতুন এ কারখানা স্থাপনের বিষয়টি আমি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব। কারখানা স্থাপনের কাজটি যাতে দ্রুত শুরু হয়, সেজন্য প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *