রাবির সাবেক ভিসির মৌখিক নির্দেশে নিয়োগের নথিতে ‘অসত্য’ তথ্য

আবুল কালাম আজাদ:- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতি সাম্প্রতিক বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার দাফতরিক নথিতে এমন একটি তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা ‘সত্য ও সঠিক’ নয়। সেই নথির একটি মোবাইল ফোনে তোলা ছবি পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তথ্যটি দাফতরিক নোট আকারে অনুমোদনের জন্য সদ্য সাবেক উপাচাযের্র (ভিসি) কাছে উপস্থাপন করা হয় তারই মৌখিক নির্দেশে। তিনিই আবার সেই নোটে অনুমোদন দেন।
সদ্য সাবেক ভিসির সঙ্গে কাজ করেছেন, এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোনালী সংবাদকে জানান, বিধি অনুযায়ী নিয়োগ সংক্রান্ত অফিস আদেশ ও নিয়োগপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সই থাকার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে তা নেই। এই অনিয়ম ঢাকতেই দাফতরিক নোটে আশ্রয় নেয়া হয় অসত্য তথ্যের।
নোটের উপস্থাপনপর্বে লেখা হয়েছে- ‘উপাচাযের্র মৌখিক নির্দেশে নিম্নোক্ত নোট উপস্থাপন করা হলো।’ এরপর নোটের মূলে লেখা রয়েছে- ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার ও অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অনুপস্থিত থাকায় বিভিন্ন পদে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষরের জন্য সংস্থাপন শাখার অফিসার ইউনিটের উপ-রেজিস্ট্রার জনাব মো. ইউসুফ আলীকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।’ উপস্থাপনের পর শেষাংশে ভিসি সই করে নোটটি অনুমোদন করেন। আর সেই নোট ব্যবহার করেই নিয়োগের পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
রাবি রেজিস্ট্রার মো. আবদুস সালাম জানান, নোটে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, তা মোটেও ‘সত্য ও সঠিক’ নয়। তিনি বলেন, ‘আমি ছুটিতে যাইনি, পদত্যাগ করিনি, এমনকি আমাকে অপসারণও করা হয়নি। সে কারণে রেজিস্ট্রার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত- এমন নোট লেখার কোনো সুযোগ নেই।’
তাহলে ঠিক কী হয়েছিলো? রেজিস্ট্রার জানান, এই নিয়োগের ব্যাপারে শুরু থেকে তিনি অবগত ছিলেন না। শেষ সময়ে তাকে বলা হলেও প্রক্রিয়া বিধি-বিধান অনুযায়ী না হওয়ায় তিনি এতে সই করতে রাজি হননি। আর সে কারণেই রাতারাতি এমন দাফতরিক নোটের আয়োজন। শনিবার অন্যসব নথিপত্রের সঙ্গে এটির অনুলিপিও সংগ্রহ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি।
এদিকে শুরু থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত বললেও সদ্য সাবেক ভিসি অধ্যাপক আবদুস সোবহান বলে আসছেন যে, তা কোনোমতেই অবৈধ নয়। তার দাবি, ১৯৭৩ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ তাকে ভিসি হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। তিনি সেটিই ব্যবহার করেছেন। এমনকি শনিবার নিয়োগপ্রাপ্তদের মিছিল সহযোগে তদন্ত কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেও তিনি একই কথা বলেছেন।
শনিবার সাবেক এই ভিসি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের ১২(৫) ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, সেই ধারায় আমি নিয়োগ দিয়েছি। ফলে এখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি। নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগে এই আইনটি বাতিল করা উচিৎ।
অধ্যাদেশের সেই ধারায় বলা হয়েছে- উপাচার্য পুরোপুরি অস্থায়ী ভিত্তিতে, অনধিক ছয় মাসের জন্য কর্মকর্তা (প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষ ব্যতীত), শিক্ষক এবং প্রশাসনিক ও অধঃস্তন কর্মচারী নিয়োগ দেয়া এবং সিন্ডিকেটে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার ক্ষমতা রাখেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সহায়তার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘উনি (ভিসি) যে ধারাটির কথা বলছেন, সেটা যেভাবে বলছেন এবং যে কারণে বলছেন, সেখানে মনে হচ্ছে, তিনি খণ্ডিতভাবে ধারাটি উল্লেখ করছেন। অধ্যাদেশ তাকে অস্থায়ী নিয়োগ দেয়ার যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেখানে কিন্তু সিন্ডিকেটকে অবগত করার কথাও বলা হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তিয়াত্তরের অধ্যাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের রক্ষাকবচ। সে কারণে সেখানে ভাইস চ্যান্সেলর অনেক পাওয়ার হোল্ড করেন। কিন্তু সেই পাওয়ার এক্সারসাইজের উদ্দেশ্যটা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থে হওয়া উচিত। আর সে কারণেই ১২(২) ধারায় বিশ্বস্ততার কথা বলা আছে। ওটা লঙ্ঘন করারও তো সুযোগ নেই।’
তিয়াত্তরের অধ্যাদেশের ১২(২) ধারায় বলা হয়েছে- এই আইন, সংবিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ যাতে বিশ্বস্তভাবে পালন করা হয় তা নিশ্চিত করা উপাচার্যের দায়িত্ব হবে এবং এই উদ্দেশ্যে তার প্রয়োজনীয় সমস্ত ক্ষমতা থাকবে।
অধ্যাপক সোবহানের দাবি অনুযায়ী, নিয়োগে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের সংঘাত হয় কি না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা এভাবে বলা মুশকিল। মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে এমন অনেক আলোচনাই আছে। তবে সেগুলো আইনের আলোকে ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে।’
রেজিস্ট্রার মো. আবদুস সালাম জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ভিসিকে চিঠি দিয়ে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছিল। সে কারণে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। ভিসি অধ্যাদেশ ও ওই নির্দেশকে সংঘাতপূর্ণ হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা করছেন সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক সাবেক সদস্যের কাছে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব কথা তিনি (ভিসি) এখন আলোচনা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য বলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি যদি এতোই আইন মানবেন, তাহলে তো তার কাছে উল্টো প্রশ্ন করতে হয় যে, ২০০৯ সালে যে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডহক নিয়োগ বন্ধের নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিলো, সেটা তিনি অমান্য করলেন কেন? প্রজ্ঞাপন কি অমান্য করার জন্য?’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান পরিস্থিতিকে অধ্যাপক সোবহান ‘সৎভাবে’ পরিচালনা করেননি বলে দাবি করে সাবেক ওই শিক্ষক বলেন, ‘তিনি (ভিসি) এখন আইনের দোহাই দিচ্ছেন, ভালো কথা। কিন্তু তিনি কেন রেজিস্ট্রার থাকার পরেও তাকে নাই দেখিয়ে তার অনুগত একজনকে দিয়ে স্বাক্ষর করালেন? তিনি ১২(৫) পড়েছেন, কিন্ত ১২(১০) কি পড়েননি? এখানে তো রেজিস্ট্রার রাজি না আর ভিসি সেটা করতে চান। আর অধ্যাদেশের ওই ধারায় তো এমনকি বডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিসি দ্বিমত করলে কী করণীয়, তা স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ১২(১০) ধারায় বলা হয়েছে- ‘উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার রেজুলেশনের সঙ্গে একমত না হলে তিনি তা আটকে দিয়ে পুনর্বিবেচনার জন্য তার মতামত যুক্ত করে সেই কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার কাছে ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা রাখেন। পরবর্তী নিয়মিত বৈঠকে সেই কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়ায় যদি উপাচার্যের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে বিষয়টি নিয়ে সিন্ডিকেটের সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ ইউজিসির সাবেক ওই সদস্য মনে করেন, অধ্যাপক সোবহান শুধুমাত্র যেনতেন প্রকারে একটা নিয়োগ দেয়ার জন্য এই সমস্ত বিধিকে উপেক্ষা করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৬ মে) উপাচার্য হিসেবে রাবিতে শেষ কর্মদিবস ছিল অধ্যাপক ড. এম আবদুস সোবহানের। আগের দিন তিনি ১৩৭ জনকে নিয়োগ দেন। এই নিয়োগ দেয়ার পরদিনই একে ‘অবৈধ’ বলেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। কেননা, রাবিতে নিয়োগদানের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। নিয়োগের পরদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে। শনিবার কমিটির চার সদস্য বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়ে সাতজনের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। সদ্য সাবেক ভিসিকেও গাড়ি পাঠিয়ে ক্যাম্পাসে ডেকে আনা হয়। সোবহান পুলিশের পাহারায় ক্যাম্পাসে যান। তাঁকে ঘিরে ছিলেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী।
এদিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা চলে যাওয়ার পর বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, যেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ বলেছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তাই বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *