রাজশাহী সরকারি মৎস্য খামারে সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে তিনগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে মাছের পোনা

আবুল কালাম আজাদ:-বছরের পর বছর অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে রাজশাহী মৎস্য ভবন খামারে সরকারি মাছের পোনা নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ২ গুন থেকে ৩ গুন দামে বিক্রয় করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।এমন  অভিযোগ করেছে খামার চাষিরা ।
এর ফলে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্য চাষীরা। বিষয়টি নিয়ে খামারিরা অভিযোগ করে আসলেও এর প্রতিকার পাচ্ছেনা।বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও মাথাব্যথা নেই কারো।
মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এদিকে ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাজা মাছ সরবরাহের কারণে রাজশাহীর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।পেয়েছৈ “লিভিং ফিশ ট্রান্সপোর্টার সিটি” উপাধি।
রাজশাহী অঞ্চলের মৎস্য চাষীরা রাজশাহী জেলা মৎস্য খামারের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বেসরকারি খামার ও নিজস্ব উদ্যোগে কিছু পোনা উৎপাদিত হলেও তা চাহিদার তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট খামার ব্যবস্থাপক, সরকারের নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুন দামে পোনা বিক্রি করে খুদে মৎস্য  চাষীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ।
রাজশাহী মহানগরীর কেন্দ্রস্থল বর্ণালী মোড়ের বিভাগীয় মৎস ভবনের বিশাল ক্যাম্পাসের ভেতরেই রয়েছে  সহকারী মৎস্য খামার।
নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা গেছে,বছরের ৯ মাস অর্থাৎ তিন মাস বাদে প্রতি সোমবার ভোর থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত পোনা বিক্রি করা হয়। এই পোনা বিক্রয়ে কোন সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থ লোপাট হচ্ছে, তেমনি ভাবে মৎস্য চাষীরা সরকারের দেয়া সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি রোববার গভীর রাতে মৎস্য চাষীদের কার কোন মাছের পোনা কতটুকু লাগবে সেটা সাদা কাগজে লিখে টোকেন দিয়ে টাকা জমা নিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। পরদিন কাকডাক ভোর থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত মাছের রেণু পোনা বিতরণ করছেন।
মৎস্যচাষীদের অভিযোগ পনার জন্য রাত্রে তাদের টাকা দেওয়া হলের সরকারি  কোন রশিদ দেওয়া হয় না ।দেওয়া হয় মাছের পরিমাণের সাদা টোকেন।
খামার সূত্রে জানা গেছে, সকল মাছের রেনু পোনার কেজি প্রতি মূল্য ১৭০০ টাকা সরকারিভাবে নির্ধারিত আছে।
কিন্তু মৎস্যচাষীদের অভিযোগ তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়, বাটা মাছের রেনু পোনা প্রতিকেজি ৪ হাজার টাকা, রুই কাতলা মাছের রেনু পোনা  কেজি প্রতি ৩ হাজার টাকা।
পোনার চাহিদা থাকায় তারা বাধ্য হয়েই চড়া দামে মাছের পোনা কিনছেন। এর ফলে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। আর অঙ্গল‌ ফুলে কলাগাছ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
 তানোর থেকে পোনা নিতে আসা আব্দুল্লাহ আল তারিক নামের এক মাছের খামারি জানালেন, সব ধরনের মাছের রেনু পোনার জন্য কেজিতে ৩০০০ টাকা এবং প্রতি ১০০ গ্রাম এর জন্য  ৩০০ টাকা ধরা হয়। একই কথা জানালেন টিকাপাড়া এলাকার সোহেল রানা, তিনি বলেন, বাটা মাছের পোনার জন্য কেজি প্রতি ৪ হাজার টাকা এবং অন্য সব মাছের পোনার জন্য ৩ হাজার টাকা করে নেয়া হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও ডজন খানেক মৎস্য চাষী।
 ন নাম প্রকাশ না করার শর্তে মৎস্য খামার অফিসের একাধিক কর্মচারী বলেন,
মা মাছ সংগ্রহের মৌসুমে প্রয়োজনের তুলনায় তিন-চার গুন বেশী মা মাছ কেনার ভাউচার তৈরী করে সরকারের টাকা আত্মসাৎ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া এই খামারে গলদা চিংড়ির একটি প্রকল্প কাগজে কলমে থাকলেও তা দৃশ্যমান হয়নি , অথচ এ প্রকল্পের ব্যয় ভাউচার করে কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছে খামারের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ।
উল্লেখ্য,  গত ২০১৯ সালের জুলাই মাসের ১৯ তারিখে জাতীয় দৈনিক সকালের সময়, ২০ তারিখে জাতীয় দৈনিক মানব জমিন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক জাগরণ, রাজশাহীর সময়.কম সহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তৎকালীন খামার ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিক এর অনিয়মের নিউজ প্রকাশিত হলে তাকে বদলি করা হয়। এরপর রাজশাহীর মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেন ড. জিনাত আরা।
তিনি যোগদানের পর কিছুদিন নিয়মাফিক খামার চালালেও তিনিও‌  আগের উত্তরসূরীর পথ অবলম্বন করে চলছেন।
খামার বিষয়ে চাষীদের অভিযোগের বিষয়টি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জানার জন্য ,তিন দিন অফিসে গিয়েও খামার ব্যবস্থাপক ড. জিনাত আরাকে অফিসে পাওয়া যায়নি ।এমনকি তার ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল (০১৭১০৯৪৫২১০) নাম্বারেও মোবাইল করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৎস্য খামারে কর্মরত ২য় শ্রেণীর একজন কর্মকর্তা জানান, খামার ব্যবস্থাপক ড, জিনাত আরা, তার নিজ এলাকার একজন সংসদ সদস্যের বোন হওয়ায় অফিসে আমতার অপব্যবহার করেন। অফিস কর্মচারীদের ৎসাথে প্রায়ই খারাপ আচরণ করেন।
আর চুরিদারির বিষয়ে কেউ কথা তুললে তিনি সদর্পে বলেন, আমার কেউ কিছুই করতে পারবে না। তিনি আরো জানান,তিনি সপ্তাহের প্রতি সোমবার সকাল ছাড়া বেশীরভাগ সময়ই অফিসে অনিয়মিত।
অপর এক কর্মচারী বলেন, পণ্য বিক্রির অতিরিক্ত টাকা  তিনি একা খান না, মৎস্য ভবনের সকল‌ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেই দেন।
অন্যদিকে ,মাষ্টার রোল(দৈনিক ভিত্তিক) কর্মচারীদের নিকট থেকে প্রতি মাসে তাদের বেতনের টাকা কর্তন করেন খামার ব্যবস্থাপক। যাহা অমানবিক। কেউ এর অর্থ দিতে না চাইলে তাকে বিভিন্ন অজুহাতে ছুটি প্রদান করেন এবং কর্মদিন কম দেখান।
অফিসে অনুপস্থিত ও মোবাইল ফোন না ধরায় খামার ব্যবস্থাপকের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা বলেন, এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে ভালো হয় ; বিষয়টি আমার জানা নাই, এখন জানলাম।ঘটনা সত্যি হলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অপরাধী যেই হোক তার কোনো ছাড় নেই।
 অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি  বলেন, ২০১৯ সালে খামার ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিক’র নামে অনিয়মের অভিযোগতিনি মিডিয়া কর্মীদের কাছ থেকেই জেনেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *