রাজশাহীতে জীবন সংগ্রামে জয়ি  একঝাঁক জয়িতাদের সংবর্ধনা দেয়া হবে

রাজশাহী প্রতিনিধি : বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে নির্যাতনের বিভীষিকাময় জীবন, নানা প্রতিবন্ধকতায় নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, সর্বস্ব হারিয়ে সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত না করতে পারার আক্ষেপ কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় হাল ছেড়ে দেওয়ার হাজারও চিত্র সমাজে বিদ্যমান।
তবে এ সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে ছাপিয়ে জীবন সংগ্রামে অপ্রতিরোধ্যভাবে যেসব নারী এগিয়ে যাচ্ছেন তারাই জয়িতা। রোববার রাজশাহীতে তাদের সংবর্ধনা দেয়া হবে।
আর এসব সংগ্রামী জয়িতাদের মধ্যে একজন সানজিদা আক্তার শিমু। সিরাজগঞ্জের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই নারী আট বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর হুইলচেয়ার তার সঙ্গী। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তাগিদে ১৬ বছর বয়সে প্রতিবন্ধকতা ও উন্নয়ন কর্মসূচির আয় বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ নেন।
প্রশিক্ষণ শেষে এনডিপি এনজিও তাকে ৫০ হাজার টাকার সার্ভিস চার্জমুক্ত ঋণ দেয়। সেই টাকা দিয়ে খড়ির কারখানা ও একটি মেশিন কেনেন। সেখান থেকে আয়-উপার্জন বাড়তে থাকলে প্রতিবেশীদের ঈর্ষার আগুনে পুড়ে যায় সব। এরপর ঘুরে দাঁড়াতে কেনেন অটোরিকশা। সেটাও চুরি হয়ে যায়। তবে দমে যাননি তিনি। বর্তমানে একটি ট্রাক, একটি মাইক্রোবাস এবং একটি সিলিন্ডার গ্যাসের শো-রুমসহ পুরাতন মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক তিনি।
এমনি আরেক সংগ্রামী নারী রাজশাহীর বাসিন্দা ড. হোসনে আরা আরজু। যিনি বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। তবে তার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ মসৃণ ছিল না। তিনি নবম শ্রেণিতে অধ্যায়নকালীন বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হারান। পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে ছোট তিন বোনের দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে।রাজশাহীতে ফুপুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনাসহ বোনদেরও পড়াশোনা করান ড. হোসনে আরা আরজু। অর্থের অভাবে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা না করতে পারলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিএ সম্মান ও স্নাত্তকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বর্তমানে এ বিভাগেই অধ্যাপনা করছেন।
আরজুর সংগ্রামটা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা হলেও ব্যতিক্রমী বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম হাটুয়া গ্রামের বাসিন্দা বুলবুলি রানী বর্মণ। হতদরিদ্র বন্যাকবলিত পরিবারের প্রথম সন্তান তিনি। পড়াশোনা তো দূরে থাক তিন বেলা খাবার জোগার করতে যাকে করতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম।
১৩ বছর বয়সে বাল্যবিয়ের সঙ্গে নতুন করে সংকটময় জীবন শুরু হয়। বন্যার ভাঙনে জীবন বিপর্যস্ত হলেও সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করতে ধান মাড়াই, মাটি কাটা, ঝিয়ের কাজ, কাঁথা সেলাইসহ বিভিন্ন পথ অতিক্রম করেছেন তিনি। মায়ের ত্যাগে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন দুই সন্তান।
এক সন্তান ৩৮তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত আছেন। আরেকজন বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনে চাকরি করছেন।
আরেক সংগ্রামী নারী বগুড়ার ফৌউজিয়া হক বীথি। যিনি নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে ধুনট উপজেলার বেলকুচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন।
উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত অবস্থায় পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করেন তিনি। এরপর যৌতুকের দাবিতে শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শিক্ষাজীবন শেষ করতে স্বামীর পক্ষ থেকে চাপ আসতে থাকে। এইচএসসি পরীক্ষার আগের দিন পিটিয়ে ঘরবন্দি করে রাখা হয় তাকে।
তবে প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে পরীক্ষার হলে পাঠান। ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে চান্স পেয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তার স্বামীও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে চান্স পান। কিন্তু থেমে থাকেনি নির্যাতন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক প্লেসে গাছের ডাল দিয়ে তাকে পেটান স্বামী। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার স্বামীকে বহিষ্কার করে। এতে তার স্বামী ক্ষেপে তাকে একাধিকবার গুম করার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশি পাহারায় শিক্ষাজীবন সফলভাবে শেষ করেন বীথি।
আরেকজন সংগ্রামী নারী পাবনার কামরুন নাহার। নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি এখন নির্যাতিত নারীদের অধিকার আদায়ে কাজ করছেন। রংপুর জেলার জুম্মাপাড়ার সম্ভ্রান্ত পরিবারের ১০ ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম তিনি।
১৯৮৫ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে বিকম পাশ করেন। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় কন্যা সন্তান জন্ম হওয়ায় তার নেশাগ্রস্ত স্বামী তার ওপর নির্যাতন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে সন্তানদের নিয়ে সংসার শুরু করেন।
১৯৯০ সালে মহিলা পরিষদের কার্যকরী সদস্য ও ১৯৯৩ সালে ৪ নম্বর জোনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০০০-২০০৭ পর্যন্ত মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক ও ২০০৭ সালে মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০১৮ সালে সিএসডব্লিউর ৬২তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। নারীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
এদিকে, জীবন সংগ্রামে ঘুরে দাঁড়ানো এই পাঁচ সফল নারী এবার রাজশাহী বিভাগে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের আওতায় রাজশাহী বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান রোববার অনুষ্ঠিত হবে। রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে।