রহনপুর-সান্তাহার রেলপথ নির্মান প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছে দুই জেলাবাসী

গোমস্তাপুর (গোমস্তাপুর) প্রতিনিধি: চাঁপাইনবাবঞ্জের রহনপুর ও নওগাঁর সান্তাহার প্রস্তাবিত রেলপথ নির্মান প্রকল্পটি বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাবাসী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর কাছে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবী জানিয়েছেন তারা। রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যথাযথ পদক্ষেপ নিলে গুরুত্বপূর্ন এ প্রকল্পটি  আলোর মুখ দেখবে বলে আশা তাদের । নানা প্রতিবন্ধকতার কারনে মাত্র  ৯৯ কিলোমিটার এ রেলপথটি নির্মাণ কাজ ১০০ বছরেও শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার জনসাধারনের এ স্বপ্ন যেন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে । এ রেল প্রকল্পটি দীর্ঘ ৮ যুগের বেশি সময় ধরে ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রসিদ্ধ রেলওয়ে জংশন সান্তাহার থেকে নওগাঁ হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পর্যন্ত এ রেলপথ নির্মাণের দাবি অপূর্নই থেকে যাচ্ছে । শুধু তাই নয়, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে কেটেছে যুগের পর যুগ। কিন্তু নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাসীর এই দাবি পূরণে কোনো সরকারই কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ফলে  প্রকল্পটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলছেন- রহনপুর ও সান্তাহার রেলপথ প্রকল্পটি যুগের পর যুগ ধরে একই অবস্থায় ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। ওই অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের প্রকল্পটি বাস্তাবায়নে আরো গতিশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে পাকশি বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আব্দুর রহিম জানান, এই প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। শুরু থেকে একই অবস্থায় পড়ে আছে।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা গেছে, ১৯২০ সালে তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট সরেজমিন রেলওয়ে প্রকল্পটি সার্ভে সম্পন্ন করে। ব্রিটিশ বিতাড়িত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে ৩ বার জরিপের প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করা হলেও ফাইলটি বারবার চাপা পড়ে যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জনগণের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রেলওয়ে বোর্ড ১৯৬৩ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষে পুনরায় জরিপ কাজ চালায়। এই জরিপ দলের নেতা উর্দ্ধতন রেলওয়ে কর্মকর্তা মরহুম আশরাফ আলী ডেল গ্রিনের রিপোর্টের স্বপক্ষে প্রতিবেদনে মত প্রকাশ করেন। আশরাফ তার অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৪ পৃষ্ঠা লিখিত রিপোর্টে এ প্রকল্পের একটি ব্লুপ্রিন্ট ১৯৬৪ সালে তদানিন্তন পাকিস্তান সরকারের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করেন। কিন্তু সব ব্যাপার সম্পন্ন হওয়ার পর রেলওয়ে বোর্ড হঠাৎ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর শুরু হল ১৯৬৬ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ১৯৬৯ র পূর্ব বাংলার গণঅভ্যূথান, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ মুক্তি সংগ্রামের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ, স্বল্প সময়ের মধ্যে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট এক চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে আশা সঞ্চারিত হলেও তা তার হত্যাকান্ডের পর সান্তাহার-রহনপুর রেল প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। আশরাফ আলী জরিপ কমিটির প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী সান্তাহার রেলওয়ে জংশন থেকে নওগাঁ শহর, মহাদেবপুর উপজেলার মহিষবাথান বাজার, পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভা, পোরশা উপজেলার সারাইগাছী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পর্যন্ত ৯৯ কিলোমিটার রেলপথ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীকালে প্রকল্পটি হাতে নিয়েও বন্ধ করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।

জানা গেছে, তৎকালীন জরিপে মাইল হিসেবে ৬৩ মাইল দীর্ঘ নওগাঁর শান্তাহার থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলওয়ে প্রকল্পটি ব্রডগেজে নির্মিত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল।  সূত্রমতে, ওই প্রকল্পটিতে ১১টি রেলওয়ে স্টেশন রাখা হয়েছিল।সেগুলোর নাম- নওগাঁ টাউন, হাটনওগাঁ, হাঁপানিয়া, জাহাঙ্গীরাবাদ, মহিষবাথান, মামুদপুর, মধইল, হযরতপুর, নিতপুর, পোরশা, নিয়ামতপুর, দাউদপুর।

এছাড়া নওগাঁ সরকারি কলেজের উত্তরে ছোট যমুনা নদীর উপরে একটি ব্রিজ এবং নজিপুরের আত্রাই নদীর উপর অপর একটি ব্রিজ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৯ সালে পার্লামেন্ট বাজেট আলোচনায় শান্তাহার-রহনপুর রেলওয়ে প্রকল্পটি আলোচনায় স্থান পায়। রেলওয়ে পশ্চিম জোন কর্তৃপক্ষের প্রকল্পটির বাস্তবায়নের জন্য কোনো সাড়া মিলে নি।

নওগাঁর বদলগাছী, মহাদেবপুর, পত্নীতলা, ধামইরহাট, সাপাহার, নিয়ামতপুর, মান্দা ও পোরশা এবংচাঁপাইয়ের রহনপুর বাসীর প্রাণের দাবি এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রহনপুর রেলবন্দর থেকে নওগাঁর সান্তাহারসহ দেশের সর্বত্র স্বল্পব্যয়ে পন্য সামগ্রী  আনা-নেয়া  করা যাবে। এছাড়া বগুড়ার সাথে সান্তাহারের রেল যোগাযোগ থাকায় প্রস্তাবিত বগুড়া – সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ হলে রাজধানী ঢাকার সাথে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

সম্প্রতি ৪৭ নওগাঁ-২ আসনের এমপি শহীদুজ্জামান সরকার ওই প্রকল্পের দাবিটি  সংসদে উত্থাপন করলেও তা গুরুত্ব পায়নি। এনিয়ে মুঠোফোনে তিনি জানান, ‘সান্তাহার থেকে রহনপুর রেলওয়ে প্রকল্পের ব্যাপারে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের  সাবেক সাংসদ ও জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিয়াউর রহমান জানান, এ বিষয়ে আমরা নতুন করে উদ্যোগ নিব। অপর সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস বলেন, তাঁর সময়ে  তিনি রেলপথ মন্ত্রানালয়নে এ বিষয়ে একটি পত্র দিয়েছিলেন।রহনপুর পৌর মেয়র মতিউর রহমান খাঁন জানান, এ অঞ্চলের প্রানের দাবি এ প্রকল্প বাস্তবায়নে তার পক্ষ থেকে সকল প্রকার চেষ্টা থাকবে।

নওগাঁর শান্তাহার  রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম ডালিম জানান, ‘জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে একটা পরীক্ষামূলক সমীক্ষা চালানো হয়। এটা অনেক আগের একটি প্রজেক্ট।

রহনপুর স্টেশন মাস্টার মো. মামুনুর রশিদ জানান, শান্তাহার-রহনপুর রেলওয়ে প্রকল্পের ব্যাপারে কয়েক বছর আগে প্রশাসনের একটা টিম এসেছিল। তার জানা মতে সেটি ওই অবস্থাতেই রয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *