বাগমারায় খনন করা পুকুরের মাটি পড়ে ১৫০ কোটি টাকার সড়কের ক্ষতি

আবু বাককার সুজন বাগমারা (রাজশাহী)
সরকারি রাস্তার ক্ষতিসাধন করলে দুই বছরের জেল বা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে আইনে। এই বিধান উল্লেখ করে রাজশাহীর বাগমারায় পুকুর মালিকদের চিঠি দেয়া হয়েছে। এই উপজেলায় পুকুর খনন ও মাটি পরিবহণের সময় ট্রাক্টর থেকে মাটি পড়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি পাকা সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। আরও অনেক সড়ক হুমকির মুখে।
বাগমারা উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় মাছ চাষের জন্য ব্যাপকভাবে পুকুর খনন চলছে। সরকারি সড়কের ধারে এসব পুকুর খননের কারণে সড়ক ভেঙ্গে যাচ্ছে। আবার পুকুরের মাটি ইটভাটায় ও অন্যত্র ট্রাকের মাধ্যমে পরিবহণের সময় মাটি পড় রাস্তার বিটুমিনের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। যার ফলে এলাকার জনগণের চলাচলে বিঘœ ঘটছে। দ্য বিল্ডিং কনষ্ট্রাকশন অ্যাক্ট ১৫২ এর ৩ ও ১২ ধারা মোতাবেক এ কাজ দন্ডনীয় অপরাধ। এ ক্ষেত্রে দুই বছরের জেল বা জরিমানা বা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে রাস্তার ক্ষতি রোধে সতর্ক করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) থেকে নোটিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাটি পরিবহণও বন্ধ হয়নি, কারও শাস্তিও হয়নি।
বাগমারায় এলজিইডির হিসাব অনুযায়ী, পুকুর খনন ও মাটি পরিবহণের কারণে এই উপজেলায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকার পাকা রাস্তার ক্ষতি হয়েছে। আর ৭০ কিলোমিটার রাস্তা এক বছরের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আরও অনেক সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে।
বাগমারা উপজেলা প্রকৌশলী সানোয়ার হোসেন বলেন, এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা রাস্তাগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। রাস্তারগুলো আগামী তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সংস্কারের কোনো প্রয়োজন পড়ত না। কিন্তু মাটি পরিবহণের কারণে এখনই রাস্তারগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব পুকুর মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ দেয়া ছাড়া তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। যাদের নোটিশ দেয়া হয়েছে তারা জবাবে বলেছেন, তারা প্রতিদিন পানি দিয়ে রাস্তায় পড়া মাটি ধূয়ে পরিষ্কার করে রাখছেন। কিন্তু কোথাও তা দেখা যায়নি।
সম্প্রতি গোবিন্দপাড়া, নরদাশ, আউচপাড়া, শুভডাঙ্গা, বাসুপাড়া, গণিপুর, গোয়ালকান্দি, মাড়িয়া, হামিরকুৎসা, ঝিকরা ও বড় বিহানালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা এবং উপজেলা সদর ভবানীগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রীতিমতো পুকুর খননের উৎসব চলছে। চারদিক থেকে পুকুরের মাটি নিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। ওইসব এলাকার পাকা রাস্তাগুলো একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। একটি মোটরসাইকেল যে পরিমাণ ধূলা উড়াচ্ছে, তাতে পথচারীদের দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা দেখা দিচ্ছে। আবার একটু বৃষ্টি হলেই এসব ধূলামাটি কাঁদামাটিতে পরিণত হয়ে বাড়ছে দূর্ঘটনা। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, এবার এই উপজেলায় যে পরিমাণ পুকুর খনন হয়েছে বিগত দশ বছরেও তা হয়নি। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এ উপজেলায় প্রায় চারশতাধিক পুকুর খনন করা হয়েছে।
কামনগর এলাকার কলেজ শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জানান, হাটবাইগাছা এলাকার দু’টি ইটভাটায় ট্রাক্টরযোগে পুকুর খননের মাটি পরিবহণের কারণে হাটবাইগাছা থেকে বসন্তপুর মোড় হয়ে শ্রীপুর রামনগর ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত পাকা সড়কটি বর্তমানে পুলোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ঝিকরা ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ ফৌজদার ও ইউপি সদস্য মানিক প্রামানিক জানান, বৈলসিংহ স্কুল সংলগ্ন কিশমত বিহানালী বিলে দিঘি খননের মাটি তক্তপাড়াস্থ ইটভাটায় পরিবহণের কারণে উপজেলা সদর ভবানীগঞ্জ পৌরসভার তক্তপাড়া থেকে বৈসিংহ বাজার পর্যন্ত পাকা সড়ক ভেঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে। একইভাবে খনন করা পুকুরের মাটি ট্রাক্টর থেকে পড়ে হাটগাঙ্গোপাড়া থেকে হাটদামনাশ পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার, গোবিন্দপাড়া জিল্লুর মোড় থেকে বাঁধের হাট পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার এবং ভবানীগঞ্জ বাজারের গোডাউন মোড় থেকে দরগামাড়িয়া মোড় পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার পাকা সড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আরও প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাকা সড়ক একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে এ এলাকায় কৃষি জমিতে পুকুর খননের মহোৎসব চলছে এবং খনন করা পুকুরের মাটি পড়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা সরকারি পাকা রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অনিল কুমার সরকার।

.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *