পাখির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রাজশাহীর অপর নাম বার্ডশাহী

আবুল কালাম আজাদ( রাজশাহী): -পদ্মা নদীর চরকে ঘিরে রাজশাহীতে নানা প্রজাতির পাখির বসবাস। এসব পাখির ছবি তুলতে চরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন পাখিপ্রেমিরা। হাসনাত রনি নামের এক পাখিপ্রেমী রাজশাহীতে তোলা কোন পাখির ছবি যখন ফেসবুকে দেন তখন রাজশাহীর বদলে লেখেন ‘বার্ডশাহী’। আবাসস্থল হিসেবে পাখিদের পছন্দের স্থান বোঝাতেই তিনি রাজশাহীকে ‘বার্ডশাহী’ বলে থাকেন।
রাজশাহীতে অনেক পাখি নিরাপদে থাকলেও শামুকখোল পাখিদের নিরাপদে থাকার জন্য রীতিমত ‘সংগ্রাম’ করতে হয়। রাজশাহী শহরে আশ্রয় নেয়া শামুখোলের বড় একটি দল মাঝে মাঝেই আশ্রয়হারা হচ্ছে। গাছ ও গাছের ডালপালা কেটে তাঁদের আশ্রয়হীন করা হয়েছে। এরপরও ঘুরেফিরে তাঁরা এই বার্ডশাহীতেই (রাজশাহী)আশ্রয় নিয়েছে।
বর্তমানে শামুকখোলের এই দলটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনের গাছপালায় আশ্রয় নিয়েছে। সংখ্যায় কত পাখি আছে তার ধারণা পাওয়া যায় না। তবে দূর থেকে গাছগুলোর ওপরে তাকালে শুধু পাখি আর পাখি চোখে পড়ে। সকালে পাখিগুলো বাসা ছেড়ে খাবারের সন্ধানে চলে যায়। সন্ধ্যার আগে আগে আবার দলবেঁধে উড়ে এসে এই গাছগুলোর বাসাতেই আশ্রয় নেয়।
প্রায় সাত-আট বছর আগে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এই পাখিরা প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর এবং আশপাশের গাছগুলোতে। সেখানে পাখিরা ভালই ছিল। কেউ তাদের ধরত না, বিরক্ত করত না। কিন্তু ২০১৯ সালে কারা প্রশিক্ষণ একাডেমীর নির্মাণ কাজ শুরু হলে অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়। পাখিগুলো আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। আশ্রয়হীন এসব পাখিরা তখন রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের গাছগুলোতে আশ্রয় নেয়।
গতবছর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এরিয়ার  গাছেরও ডালপালা কাটতে শুরু করেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াজদানী। তাঁর যুক্তি ছিল- পাখিরা যখন-তখন মলত্যাগ করে বসে। পাখির বিষ্ঠা রোগীর স্বজনদের গায়ে পড়ে। হাসপাতাল কখনও পাখির অভয়াশ্রম হতে পারে না। পরে পাখিরা হাসপাতালের পূর্ব পাশের রাস্তার ধারের গাছগুলোতে আশ্রয় নেয়।
কিন্তু কিছুদিন পরই পাখিগুলোকে আবারও আশ্রয়হীন হতে হয়েছে। সম্প্রতি হাসপাতালের পুরনো সীমানা প্রাচীর ভেঙে নতুন করে নির্মাণের সময় প্রায় অর্ধশত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। তাই পাখিরা এবার আশ্রয় নিয়েছে হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে। বার বার আশ্রয়হীন হওয়ার পরও পাখিগুলো রাজশাহী ছেড়ে যায়নি। এখন পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকছে হাসপাতালের বহির্বিভাগ।
বৃহস্পতিবার সকালে রোগীরা যখন বহিবির্ভাগে আসতে শুরু করে তখন পাখিরা খাবারের সন্ধানে বের হয়ে যায়। পাখিদের উড়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখেন, রোগী পথচারী ও স্থানীয়রা।একসঙ্গে এতগুলো বড় বড় পাখি সচরাচর দেখা যায় না।
শামুকখোল সাইকোনিডি গোত্রের অন্তর্গত বড়সড় আকারের জলচর পাখি। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। রামেক হাসপাতালের এই পাখিগুলো কখনও দলবেঁধে পদ্মার চর আবার কখনও বরেন্দ্র এলাকার ধান খেতে চরতে যায়। দিনশেষে তাঁরা আবারও আপন নীড়ে ফিরে আসে।
রাজশাহীর সেভ দ্য নেচার অ্যান্ড লাইফের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় সাত-আট বছর ধরেই পাখিগুলো রাজশাহীতে আছে। এরই মধ্যে গাছ ও ডালপালা কেটে ফেলায় তিনবার পাখিগুলো আশ্রয়হীন হয়েছে। প্রতিবারই আমরা প্রতিবাদ করেছি। আমরা আশা করি পাখিগুলো এখন যেখানে আছে সেখানে থাকতে পারবে। কারণ, প্রকৃতি নিয়েই আমাদের বাঁচতে হয় এবং এরা প্রকৃতিরই অংশ।
রাজশাহীর দুর্গাপুর ও বাঘা উপজেলাতেও শামুকখোল পাখিদের আবাস রয়েছে। হাজার হাজার পাখির কারণে গাছে আম ধরছিল না বলে বাঘার খোর্দ্দবাউসা গ্রামের পাখিদের তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন বাগান মালিকেরা। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এলে উচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে আসে। আদালত বাগানমালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে পাখিদের আবাস নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। এরপর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে খোর্দ্দবাউসা গ্রামের বাগান মালিকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৯ সালের ভাড়া হিসেবে চলতি বছরের ২১ মে পাঁচজন বাগান মালিক ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকার চেক পেয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *