গোটা রেলপথই মরণফাঁদ অরক্ষিত ৮২ শতাংশ রেলক্রসিং

রেললাইন মরণফাঁদই থেকে যাচ্ছে। নতুন বছরের তিন দিনে ট্রেনের কাটা পড়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাজধানীর খিলখাঁও এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারান জীবন বীমা করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাইদুল আলম (৫৫)। প্রতিবছর গড়ে ৭শ লোক প্রাণ হারান রেলপথে। মাত্র ৫ শতাংশ দুর্ঘটনার দায় নিতে চায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বাকি ৯৫ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য রেল দায়ী করছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও যান চালকদের। সচেতন মহলের মতে, পুরো রেলপথ উন্মুক্ত। সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন যান ইচ্ছেমতো ক্রসিং পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। রেল কর্তৃপক্ষ অবৈধ লেভেলক্রসিং বন্ধ করছে না, লাইনের দুপাশে বেড়া দিচ্ছে না। ফলে রেলপথ সব সময়ই মরণফাঁদ হয়ে আছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আট বছরে শুধু ট্রেন দুর্ঘটনায় ২৫৩ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে ১৯৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন রেলক্রসিংয়ে। একই সময়ে ট্রেনের ধাক্কা, লেভেলক্রসিং, আত্মহত্যাসহ বিভিন্নভাবে মারা গেছেন ৫ হাজার ৬শ জন। একসঙ্গে বেশি লোক প্রাণ হারাচ্ছে লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায়। ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৪ জন। এছাড়া রেলপথ দিয়ে হাঁটা, ফোনে কথা বলে হাঁটা এবং আত্মহত্যাজনিত কারণে অনেকে মারা যাচ্ছেন। ২০০৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রেলে ৭৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটছে। এরমধ্যে চলার পথে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৯৭টি।
লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা সম্পর্কে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, ‘ট্রেন নির্ধারিত পথে চলে, রাস্তায় গিয়ে কোনো যানকে ধাক্কা দেয় না। বরং বিভিন্ন যান লাইনে উঠে ট্রেনকে ধাক্কা দিচ্ছে। এতে রেলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কখনও কখনও ট্রেনযাত্রীও প্রাণ হারাচ্ছেন।’
রেলওয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, রেলপথ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় সাড়ে ৭শ লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় হত্যার পর রেলপথে ফেলা রাখা লাশও উদ্ধার হয়। প্রতিবছরই খুনের পর লাশ রেললাইনে ফেলার ঘটনা রয়েছে। ২০১৯ সালে ৫ জন, ২০১৮ সালে ৪ জন, ২০১৭ সালে ৪ জন, ২০১৬ সালে ৩ জন, ২০১৫ সালে ২ জন, ২০১৬ সালে ৩ জন, ২০১৭ সালে ২ জন, ২০১৮ সালে ২ জন, ২০১৯ সালে ২ জন এবং ২০২১ সালে ১ জনকে হত্যার পর লাশ রেলপথে ফেলে রাখা হয়। এদের বেশিরভাগই ছাত্রছাত্রী বা যুবক, কিশোর-কিশোরী। ২০২০ এবং ২০২১ সালে করোনার কারণে বিভিন্ন সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় রেলপথ থেকে বিগত বছরগুলোর তুলানায় লাশ কম উদ্ধার হয়।
রেলওয়ে পরিবহণ ও প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ট্রেনের নিচে বা ধাক্কায় মৃত্যু বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই বেশি। লাইন দিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশেই হাঁটে। রেলওয়ে পুলিশ বলছে, ব্রিটিশ শাসনামলের ১৮৬১ সালের পুরোনো আইনে রেল চলছে। এ আইনের ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী রেললাইনের দুই পাশে ২০ ফুটের মধ্যে নির্দিষ্ট মানুষ ছাড়া কেউ এমনকি গবাদিপশুরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। লাইনের দুই পাশের ২০ ফুট এলাকায় সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। ওই সীমানার ভেতর কাউকে পাওয়া গেলে গ্রেফতার করা যাবে। কিন্তু লাইন দিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষ হাঁটলেও কাউকে আটক করার নজির নেই।
রাজধানীর কাওরান বাজার লেভেলক্রসিং এলাকায় দেখা যায়, রাত-দিন সব সময় রেললাইন ধরে মানুষ হাঁটছে। কমলাপুর থেকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত লাইন দিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষ সড়ক পথের মতো চলাচল করছে। ট্রেন আসার ঘণ্টা পড়লেও মানুষ লাইন থেকে উঠতে চায় না।
রেলওয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযোগ, বিকাল হলেই অনেক যুবক, কিশোর-কিশোরী রেললাইন ও লাইনের পাশে বসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার ও মোবাইল গেম খেলায় মেতে ওঠে তারা। অনেকে নেশা করতে বসে। লোকবলের অভাবে পুরো রেলপথ পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া লাইন দিয়ে হাঁটলে বা লাইনে বসায় এর আগে আটক করার নজির না থাকায়, এখন কাউকে আটক করা হয় না।
রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে, বিমানবন্দর-টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইন যেন সড়কপথ। এপথ ধরে দিন-রাত শত শত লোক চলাচল করেন। ঢাকা রেলওয়ে রেঞ্জেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা হয়। রেল থেকে হাজারও সচেতন বার্তা-ব্যানার ফেস্টুন লাগালেও সাধারণ মানুষ সচেতন হচ্ছেন না। নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু এবং পূবাইল রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ঢাকা রেঞ্জের মধ্যে। এ পথেই ট্রেনে কাটা পড়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষকে সচেতন করতে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মাইকিং, ব্যানার, ফেস্টুন বিতরণ করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।
রেলওয়ে গত এক যুগে রেললাইন তৈরি ও কেনাকাটায় প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। সওজ প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করছে। কিন্তু লেভেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেউ দায়িত্ব নিতে চাইছে না। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে মোট রেলক্রসিংয়ের মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। এসব ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। আরও আছে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সড়কে। সব মিলিয়ে দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *